সংগৃহীত

সহিংসতার নিন্দা জানিয়ে মাখোঁ বললেন, ‘ফরাসিরা ফ্রান্সের সঙ্গে এমন করতে পারে কীভাবে’

জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে চলা বিক্ষোভে ‘লাগামহীন’ সহিংসতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন দেশটির প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাখোঁ।

রাজধানী প্যারিসে বিক্ষোভকারী ও লুটপাটকারীদের সঙ্গে পুলিশের নতুন করে সংঘর্ষের পর গতকাল রোববার মাখোঁ এই নিন্দা জানান।

ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, শনিবারের সহিংসতার ঘটনায় প্রায় ২ হাজার ৪০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ফ্রান্সের শহরাঞ্চলে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনাগুলোর একটি ছিল এটি। এতে প্রায় এক হাজার পুলিশ ও জেন্ডারমেরি (ফ্রান্সের সামরিক কাঠামোর অধীন একটি সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী) সদস্য আহত হয়েছেন। তাঁদের মধ্যে সাতজনের অবস্থা গুরুতর।

রোববার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে মাখোঁ বলেন, প্রয়োজন হলে আগামী কয়েক দিনে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট কিছু সমাবেশ নিষিদ্ধ করতে পারবে। তবে জরুরি অবস্থা জারি বা কারফিউ দেওয়ার মতো কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দেননি তিনি।

বিক্ষোভে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞের প্রসঙ্গে মাখোঁ বলেন, ‘আজ রাতে আমরা সবাই ক্ষোভ ও লজ্জা অনুভব করছি।’

প্যারিসে বিক্ষোভের সময় দেওয়া আগুন নেভানোর চেষ্টা করছেন এক ব্যক্তি। ১৭ অক্টোবর ২০২৬

শনিবারের বিক্ষোভে একাধিক টাউন হলে আগুন দেওয়া হয়। এ ছাড়া শত শত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে লুটপাট বা ভাঙচুর চালানো হয়।

রোববার জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে মাখোঁ বলেন, প্রয়োজন হলে আগামী কয়েক দিনে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ নির্দিষ্ট কিছু সমাবেশ নিষিদ্ধ করতে পারবে। তবে জরুরি অবস্থা জারি বা কারফিউ দেওয়ার মতো কঠোর পদক্ষেপের ঘোষণা দেননি তিনি।

মাখোঁ বলেন, ‘এই ছবিগুলো দেখে আমরা সবাই নিজেদের প্রশ্ন করেছি, তাদের মনে কী চলছে? ফরাসিরা ফ্রান্সের সঙ্গে এমন করতে পারে কীভাবে?’

মাখোঁ জোর দিয়ে বলেন, যেসব বিক্ষোভকারীর দাবি যৌক্তিক, তাঁদের সঙ্গে ধ্বংসযজ্ঞ, ভাঙচুর ও লুটপাটে জড়িত ব্যক্তিদের পার্থক্য করতে হবে।

মাখোঁ আরও বলেন, চরম বামপন্থী প্রান্তিক গোষ্ঠীর উসকানিদাতাদের বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ কোনো ধরনের ছাড় দেবে না। তাদের সঙ্গে বিপুলসংখ্যক অপরাধীও যোগ দিয়েছে। এসব লোকই ফ্রান্সের শহরগুলোতে লাগামহীন সহিংসতা ছড়িয়েছে।

ফ্রান্সজুড়ে এই অস্থিরতা এমন সময়ে ছড়িয়ে পড়েছে, যখন দেশটিতে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন হতে আর মাত্র কয়েক মাস বাকি। মধ্যপন্থী মাখোঁ আর নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না। অন্যদিকে, কট্টর ডানপন্থী ন্যাশনাল র্যালি পার্টির প্রেসিডেন্ট প্রার্থী মেরিন লো পেন জনমত জরিপে এগিয়ে রয়েছেন।

লো পেন বলেন, এই অস্থিরতা দেখিয়ে দিয়েছে, মাখোঁর সরকারের জ্বালানি ফুরিয়ে এসেছে। সরকার ক্লান্ত ও দিশেহারা হয়ে পড়েছে।

রোববার প্যারিসের একটি চত্বরে জড়ো হওয়া কয়েক শ মানুষের ওপর পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও স্টান গ্রেনেড ছোড়ে বলে জানিয়েছেন এএফপির সাংবাদিকেরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আহ্বানের পর সেখানে লোকজন জড়ো হয়। তবে কর্তৃপক্ষ জানায়, সমাবেশটির অনুমোদন ছিল না।

কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, বিক্ষোভকারীরা পুলিশের দিকে বোতল ও পাথর ছোড়ে। এ ঘটনায় প্যারিসজুড়ে ১০৮ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। রিপাবলিক চত্বরের আশপাশে অন্তত পাঁচটি দোকানে লুটপাট চালানো হয়।

প্যারিসের কেন্দ্রীয় এলাকার কয়েকটি দোকানের কাচ ভাঙচুর করা হয়েছে। নগর কর্তৃপক্ষ অনেক দোকান বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছে।

দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর লিয়ঁতে একটি বিলাসবহুল পোশাকের দোকানে লুটপাটের চেষ্টা করা তরুণদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে।

প্যারিসে বিক্ষোভ চলাকালে ভাংচুর ও লুটপাট চালানো একটি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন এক ব্যক্তি। ১৮ অক্টোবর ২০২৬

ফ্রান্সের টাউন হলগুলোতে আগুন জ্বলছে, দোকানে লুটপাট চলছে—এমন ছবি বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম হয়েছে। এ নিয়ে বিতর্কে যোগ দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি এই অস্থিরতার জন্য অভিবাসনকে দায়ী করেছেন।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প বলেন, ফ্রান্স জ্বলছে। সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জগৎ থেকে আসা, হৃদয়ে ঘৃণা পোষণ করা অভিবাসীরা একসময়কার মহান দেশটিকে ধ্বংস করে দিয়েছে।

মাখোঁ বলেছেন, ‘শীর্ষ কর্মকর্তারা আমাদের শহর, সরকারি ভবন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলো সুরক্ষিত রাখতে মেয়রদের সঙ্গে সমন্বয় করে সিদ্ধান্ত নেবেন।’

ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সহায়তা করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন মাখোঁ। বিক্ষোভ মোকাবিলায় নিরাপত্তা বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে ‘পূর্ণ স্বচ্ছতা’ নিশ্চিত করার কথাও বলেছেন তিনি।

শনিবারের বিক্ষোভের পর পুড়ে যাওয়া সড়ক-ব্যারিকেডের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন প্যারিসের ৭৮ বছর বয়সী বাসিন্দা মেহমেত ওজেদেন। তিনি এএফপিকে বলেন, ‘মনে হচ্ছে, যেন আমরা যুদ্ধের মধ্য দিয়ে গেছি।’

সহিংসতা, ভাংচুর ও অগ্নিসংযোগের পর শহর পরিষ্কারে নেমেছেন পৌরকর্মীরা। প্যারিস, ফ্রান্স, ১৮ অক্টোবর ২০২৬

লিমোজ শহরের পুরানো টাউন হলটি আগুনে পুড়ে গেছে। স্থানীয় প্রশাসন বলছে, উচ্ছৃঙ্খল জনতা ইচ্ছাকৃতভাবে সেখানে আগুন দিয়েছে।

লিয়ঁ শহরের কেন্দ্রে বিক্ষোভ চলাকালে একটি পর্যটন তথ্যকেন্দ্রে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এ সময় একাধিক সংঘর্ষ ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে।

ফ্রান্সের শহর সাঁ-এতিয়েনে ভিড় নিয়ন্ত্রণে ব্যবহৃত একটি গ্রেনেডের বিস্ফোরণে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরের ডান হাত উড়ে গেছে। মুলুজ শহরে ১৭ বছর বয়সী এক কিশোরী একটি চোখ হারিয়েছে বলে জানিয়েছেন কৌঁসুলিরা।

source https://www.prothomalo.com/world/europe/ctfn5g8alg

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।