সৌদি আরবে যে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, তাঁদের একজন নারী—আর তাঁর পরিবার খবরটি পেয়েছে সরকারের কাছ থেকে নয়, মেয়ের এক বান্ধবীর ফোনে। অন্যজনের বাবার অভিযোগ, প্রায় তিন বছর ছেলে সৌদি কারাগারে থাকলেও সরকারের পক্ষ থেকে কেউ কোনো খোঁজ নেয়নি। বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনে উঠে এসেছে দুই পরিবারের এই অসহায়তার চিত্র, আর আবারও সামনে এসেছে প্রশ্ন—প্রবাসে বিপদে পড়া বাংলাদেশিদের পাশে রাষ্ট্র কোথায়?
বান্ধবীর ফোনে মৃত্যুর খবর, ছবির সঙ্গে মিল খুঁজে পাননি স্বজনেরা
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া নারীর বাড়ি টাঙ্গাইলে বলে জানা গেছে। পরিবার বলছে, তিনি মৃত্যুদণ্ড পাওয়ার মতো কোনো অপরাধ করেছিলেন কি না, তা তাঁরা জানতেন না। হঠাৎ মেয়ের এক বান্ধবী ফোন করে জানান, তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়েছে, এবং খবরটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ছড়িয়েছে। একটি ভিডিওও পাঠানো হয় পরিবারের কাছে।
তবু খবর জেনে শুরুতে চুপ ছিলেন পরিবারের সদস্যরা—কারণ সৌদি আরব থেকে পাঠানো ছবির সঙ্গে নিজেদের মেয়ের মিল খুঁজে পাচ্ছিলেন না তাঁরা। সরকার বা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও তাঁদের কিছু জানানো হয়নি।
দিনমজুর বাবার সংসারে সচ্ছলতার স্বপ্ন নিয়ে বিদেশযাত্রা
পরিবার জানায়, চার বোনের মধ্যে সবার ছোট ছিলেন তিনি। দিনমজুর বাবার সংসারে সচ্ছলতা আনার আশায় ২০২৩ সালে কাজের ভিসায় সৌদি আরবে যান। যাওয়ার ছয় মাসের মাথায় গ্রেপ্তার হন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, শুরুতে তিনি জানিয়েছিলেন—এক ঘরে অনেক মেয়ে থাকতেন, আর মালিকের কোনো কাজের কারণে সবাইকে ধরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এর বেশি কিছু তিনি বলেননি; শুধু বলেছিলেন, দেশে ফিরে সব বলবেন।
কারাগারে থাকা অবস্থাতেও মাসখানেক পরপর পরিবারের সঙ্গে কথা বলতেন তিনি। সর্বশেষ ফোন এসেছিল মঙ্গলবার। পরিবারের ধারণা, পরদিন বুধবার তাঁর মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। স্বজনেরা জানান, বুধবার থেকে ফোন আসছিল, কিন্তু রিসিভ করলেও ওপাশ থেকে কোনো শব্দ শোনা যায়নি।
“তিন বছরে সরকারের কেউ খোঁজ নেয়নি”—অন্যজনের বাবা
মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া বাংলাদেশি পুরুষটির বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বলে জানা গেছে। তাঁর বাবা জানান, গত বুধবার তাঁরা ছেলের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর জানতে পারেন। তার আগের রোববারই ফোনে ছেলের সঙ্গে শেষ কথা হয়েছিল—কুশল বিনিময়, বাবার শরীরের খোঁজ।
তাঁর অভিযোগ, প্রায় তিন বছর ছেলে কারাগারে থাকলেও সরকারের পক্ষ থেকে কেউ খোঁজ নেয়নি। তিনি বিবিসি বাংলাকে বলেন, ভারতীয়, পাকিস্তানি বা শ্রীলঙ্কান নাগরিক কারাগারে গেলে তাঁদের দেশের লোক খোঁজ নিতে যান—কে কোন কারাগারে আছেন, সমস্যা কী, সব জানতে চান; কিন্তু বাংলাদেশ থেকে কেউ যাননি, কেউ খোঁজও নেননি।
অভিযোগ কী ছিল, সরকার কী বলছে
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, মক্কার একটি মসজিদে অনৈতিক কাজের অভিযোগে সৌদি আরবের আদালত তাঁদের দোষী সাব্যস্ত করে এবং মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করে। ঢাকার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা সৌদি আরবে বাংলাদেশ দূতাবাস—কোনো পক্ষ থেকেই এই দুজনের পরিচয় নিয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
পরিবারের দাবির পর টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া নারীর বাড়ি টাঙ্গাইলে—এ তথ্য তারা স্থানীয়ভাবে জেনেছে, তবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে কোনো বার্তা পায়নি। প্রশাসন বলছে, কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে মন্ত্রণালয়কে জানানো হবে এবং পরিবারকে কীভাবে সহায়তা করা যায়, তা দেখা হবে। অন্যদিকে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামীম মঈন বলেছেন, বিস্তারিত জানতে দুই দিন আগে সৌদি সরকারকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ।
প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে
দীর্ঘ সময় ধরে বিচারপ্রক্রিয়া চললেও ঢাকা কেন আগে কিছু জানল না—এই প্রশ্ন নিয়ে গতকালই জাতীয় দৈনিকে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। সেই আলোচনা পড়ুন আমাদের ২১ অক্টোবরের প্রধান খবর ও পত্রিকার শিরোনাম পর্যালোচনায়। দুই পরিবারের অভিজ্ঞতা দেখাচ্ছে, বিদেশের কারাগারে আটক কর্মীদের খোঁজখবর রাখা, আইনি সহায়তা দেওয়া এবং পরিবারকে সময়মতো জানানোর ব্যবস্থায় বড় ঘাটতি রয়ে গেছে।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
সৌদি আরবে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়া দুই বাংলাদেশির বাড়ি কোথায়?
বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন অনুযায়ী, নারীর বাড়ি টাঙ্গাইলে এবং পুরুষের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। সরকারিভাবে তাঁদের পরিচয় এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
পরিবার মৃত্যুদণ্ডের খবর কীভাবে জানল?
নারীর পরিবার খবর পায় তাঁর এক বান্ধবীর ফোনে ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে; সরকার বা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাঁদের কিছু জানানো হয়নি।
সরকার এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নিয়েছে?
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামীম মঈন জানিয়েছেন, বিস্তারিত জানতে সৌদি সরকারকে চিঠি দেওয়া হয়েছে। টাঙ্গাইল জেলা প্রশাসন পরিবারকে সহায়তার কথা বলেছে।
এই প্রতিবেদন বিবিসি বাংলার ভিডিও প্রতিবেদনের তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি। বিস্তারিত দেখুন বিবিসি বাংলা। প্রতিদিনের খবর ভিডিওতে দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন সাউথ এশিয়ান রিপোর্ট বাংলা ইউটিউব চ্যানেল।



