সংগৃহীত

বায়োস্কোপ থেকে ফেসবুকের যুগ

খুব ছোটবেলার কথা, তখন আমরা আশির দশকের অবোধ শিশু। বয়স কম হলেও সেই সোনালি সময়ের কিছু স্মৃতি আজও মনের ক্যানভাসে নিবু নিবু না হলেও কিছুটা উজ্জ্বল হয়ে আছে।

শৈশবের প্রথম বিস্ময় ছিল বায়োস্কোপ। মাঝেমধ্যেই বায়োস্কোপওয়ালা ডুগডুগি বাজাতে বাজাতে আমাদের গ্রামের বাড়ির বাইর বাড়িতে (সামনের উঠোনে) এসে হাজির হতেন। একটা কালো টিনের বাক্স, যার এক পাশে হ্যান্ডেল আর অন্য পাশে গোল গোল দুটো ফুটো। সেই ফুটোয় চোখ রেখে ভেতরের জাদুর দুনিয়ায় তাকিয়ে থাকতাম। বায়োস্কোপ দেখার জন্য তখন সব সময় টাকা লাগত না; মায়ের কাছ থেকে চেয়ে আনা ধান কিংবা চাল দিয়েও বায়োস্কোপ দেখা যেত! বায়োস্কোপওয়ালা যখন হ্যান্ডেল ঘুরিয়ে সুর করে ছন্দ মেলাতেন—
‘কী চমৎকার দেখা গেল, ঢাকার শহর আইসা গেল
রঙ্গিলা রঙ্গের মেলা, দেখেন চম্পা জহরের খেলা’

তখন বুকের ভেতর এক অদ্ভুত রোমাঞ্চ কাজ করত! হ্যান্ডেল ঘোরানোর সঙ্গে সঙ্গে ভেতরের পর্দায় ভেসে উঠত সিনেমার নায়ক-নায়িকাদের সুন্দর সুন্দর মুখ। ওটুকু বয়সে সেটাকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় জাদুকরি জিনিস মনে হতো।

এরপর গ্রামে যখন প্রথম টেলিভিশন এল, সে এক এলাহি কাণ্ড! আমাদের গ্রামের প্রাইমারি স্কুলমাঠে প্রথম একটা টিভি ভাড়া করে আনা হয়েছিল, যা চালানো হয়েছিল বড় ব্যাটারি দিয়ে। পুরো গ্রামের পুরুষ মানুষ আর ছোট বাচ্চারা সেদিন ভেঙে পড়েছিল সেই টিভি দেখার জন্য।

আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে শহরেও প্রযুক্তি সহজলভ্য হয়ে ওঠেনি। পুরো পাড়ায় বড়জোর একটা কিংবা দু-একটা বাসায় টেলিভিশন থাকত। তাতেই ড্রয়িংরুম কিংবা উঠোন হয়ে উঠত একেকটা মিনি সিনেমা হল! বিশেষ করে শুক্রবারের সিনেমা দেখার জন্য পাড়ার সবাই মিলে ভীষণ আগ্রহ নিয়ে ভিড় জমাত! তখন টিভির দিকে তাকিয়ে শুধু একটাই চিন্তা মাথায় ঘুরপাক খেত—
‘এই ছোট্ট বাক্সের ভেতর মানুষগুলো ঢুকল কীভাবে?’

ঠিক একই রকম বিস্ময় জাগত রেডিও নিয়ে। রেডিওতে যখন গান বাজত, ভাবতাম মানুষগুলো নিশ্চয়ই ভেতরে বসে গাইছে! তখনকার দিনে দাদা-নানারা ঘড়ি ধরে রেডিওর সামনে বসে যেতেন বিবিসি সংবাদ শোনার জন্য। অনেক সময় যখন নেটওয়ার্ক ক্লিয়ার হতো না, তখন রেডিওর এন্টেনা টেনে লম্বা করে এদিক-ওদিক ঘোরানোর সেই আকুলতা আজও চোখে ভাসে।

আর আজ? সময় বদলেছে, বদলেছে প্রযুক্তি। আমরা এখন ফেসবুকের যুগে বাস করি। এখন আর মানুষের মুখ দেখার জন্য বায়োস্কোপ বা টিভির সামনে চাতক পাখির মতো বসে থাকতে হয় না। স্ক্রিনে একটা ক্লিক করলেই মানুষের মুখ দেখা যায়। তবে রূপক অর্থে বলতে গেলে, এখন মানুষ শুধু মানুষের মুখই দেখে না, স্ক্রিনের আড়ালে থাকা মানুষের ভেতরের রূপ বা অন্তরটাও যেন সহজে চিনে ফেলা যায়।

প্রযুক্তির এই বিশাল বিবর্তনে অনেক কিছু পেয়েছি সত্যি, তবে আশির দশকের সেই নিষ্পাপ শৈশব, ধান-চাল দিয়ে বায়োস্কোপ দেখার আনন্দ আর যৌথ বিস্ময়ের দিনগুলো আজ শুধুই মধুর স্মৃতি।

উত্তরা, ঢাকা

source https://www.bondhushava.com/feature/60t5ms65eq

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।