আজকের পর্যালোচনায় রয়েছে বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের গভীর আর্থিক সংকট, দুবাইতে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদের নাটকীয় গ্রেফতার, সুন্দরবনে দস্যু বাহিনীর পুনরুত্থান, লালমনিরহাটে শিশু হত্যায় জনরোষ, ধর্ষণ মামলায় বিচার বিলম্বের সংকট এবং তরুণ প্রজন্মের মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যয়।
এনআরবিসি ব্যাংক মুছে ফেলেছে ১১ লাখ তথ্য
বাংলাদেশ ব্যাংকের ফরেনসিক অডিট রিপোর্টে উদ্ঘাটিত: এনআরবিসি ব্যাংক অর্থ লুটপাটের প্রমাণ গোপন করতে আইটি সিস্টেম থেকে প্রায় ১১ লাখ তথ্য মুছে দিয়েছে।
বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে দুর্নীতির ইতিহাসে নতুন এক অধ্যায় যুক্ত হলো। নন-রেসিডেনসিয়াল বাংলাদেশি কমার্শিয়াল বা এনআরবিসি ব্যাংক কেবল অর্থ লুটপাটেই থামেনি — তার প্রমাণ ধ্বংস করতে ডিজিটাল তথ্য মুছে ফেলার মতো ভয়াবহ পদক্ষেপ নিয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশে পরিচালিত ফরেনসিক অডিটে উঠে এসেছে যে, ব্যাংকটি খেলাপি ঋণের প্রকৃত চিত্র আড়াল করেছে, হাজার কোটি টাকার প্রভিশন ঘাটতি লুকিয়ে রেখেছে এবং শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের নামে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে।
এই কেলেঙ্কারিতে সন্দেহভাজনদের মধ্যে রয়েছেন ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এসএম পারভেজ তমাল, নির্বাহী কমিটির চেয়ারম্যান আদনান ইমাম এবং সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মুজিবুর রহমান। উল্লেখযোগ্য যে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরেও এই অনিয়ম চলমান ছিল — যা নতুন সরকারের আর্থিক নজরদারির দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
বেনজীরকে ধরিয়ে দেন ঘনিষ্ঠ বন্ধু!
সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক বেনজীর আহমেদের দুবাইতে গ্রেফতারের গল্পটি রীতিমতো চলচ্চিত্রের কাহিনির মতো। তাকে বিমানবন্দর থেকে ধরা হয়নি — ধরা হয়েছে একটি শপিংমলের কফিশপ থেকে, কৌশলগত ফাঁদ পেতে।
বন্ধু বেনজীরকে বাসা থেকে ডেকে কফি খাওয়ার ছলে শপিংমলে নিয়ে গেলেন। আড্ডার মাঝপথেই পুলিশ এসে উপস্থিত হলো। পরিস্থিতি বুঝতে পেরে বন্ধু চুপচাপ সটকে পড়লেন।
— পুলিশ সদর দপ্তরের গোয়েন্দা ইউনিটের সূত্র, দেশ রূপান্তরযে বন্ধু এই ফাঁদ পেতেছেন, তিনি একজন আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনৈতিক নেতা, যিনি বর্তমানে দুবাইতে বসবাস করছেন এবং দুবাই পুলিশের সাথে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে।
বেনজীর আহমেদকে দুবাই পুলিশ সদর দপ্তরে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করলেও তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিস ইতিমধ্যে জারি ছিল। এই তথ্য পুলিশ সদর দপ্তরের গোয়েন্দা ইউনিটের একজন কর্মকর্তা দুবাইয়ে বেনজীরের আত্মীয়ের কাছ থেকে নিশ্চিত করেছেন।
ক্যাপাসিটি চার্জের বোঝা দেড় দশকে বেড়ে ৯ গুণ
বিদ্যুৎ না বিক্রি করলেও টাকা পাওয়ার নিশ্চয়তা — এই “ক্যাপাসিটি চার্জ” ব্যবস্থাটিকে পর্যবেক্ষকেরা এখন সরাসরি লুটপাটের হাতিয়ার হিসেবে চিহ্নিত করছেন। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বসিয়ে থাকলেও সরকারকে চুক্তি অনুযায়ী নির্দিষ্ট অর্থ পরিশোধ করতে হয়।
প্রয়োজনের তুলনায় দ্বিগুণ সক্ষমতার বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো কার্যত সরকার ও জনগণ উভয়ের জন্যই বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
— বিশেষজ্ঞ পর্যবেক্ষকদের মন্তব্য, আজকের পত্রিকাএই বোঝার চাপ শেষ পর্যন্ত পড়ছে সাধারণ বিদ্যুৎ ভোক্তার উপর। ব্যবসায়িক স্বার্থে তৈরি হওয়া অতিরিক্ত বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে জনগণের অর্থ শোষণ করছে।
সুন্দরবনে সক্রিয় সাত দস্যু বাহিনী
২০১৮ সালে সুন্দরবনকে “দস্যুমুক্ত” ঘোষণা করা হয়েছিল। কিন্তু সেই ঘোষণা এখন অনেকটাই অর্থহীন হয়ে পড়েছে। ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলের বুকে আবার জেগে উঠছে সংঘবদ্ধ দস্যুচক্র।
- করিম শরীফ বাহিনী
- দুলাভাই বাহিনী
- বড় জাহাঙ্গীর বাহিনী
- ছোট জাহাঙ্গীর বাহিনী
- দয়াল বাহিনী
- নানা ভাই (ডন) বাহিনী
- কাজল মুন্না (জনাব) বাহিনী
অপহরণ, মুক্তিপণ আদায়, নদীপথে চাঁদাবাজি, জেলে-বনজীবীদের জিম্মি করা ও পর্যটকদের ভয়ভীতি প্রদর্শন আবার শুরু হয়েছে। সম্প্রতি মোংলার জয়মনির ঘোল এলাকায় কোস্ট গার্ডের হাড়বাড়িয়া স্টেশনে দুর্বৃত্তদের সংঘবদ্ধ হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা পরিস্থিতির ভয়াবহতা স্পষ্ট করে তুলেছে।
আদিতমারী রণক্ষেত্র: ডিসি-এসপি’র গাড়ি ভাঙচুর
লালমনিরহাটের আদিতমারীতে সাত বছরের শিশু নন্দিনীকে ধর্ষণের পর হত্যা। মরদেহ উদ্ধার হয়েছে ফলিমারী গ্রামের ভুট্টাক্ষেত থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায়।
এই নির্মম হত্যার খবর ছড়িয়ে পড়তেই ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী মূল অভিযুক্ত বিধান চন্দ্রকে তার বাড়িতে অবরুদ্ধ করে এবং বাড়িতে আগুন দেয়। পুলিশ আসামিকে আটক করার পর জনতা তাকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করলে ব্যাপক সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।
জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ পাঁচটি সরকারি গাড়ি ভাঙচুর করা হয়। অতিরিক্ত পুলিশ ও বিজিবি টিয়ারশেল নিক্ষেপ করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। বছরের পর বছর ধরে জমে ওঠা বিচারহীনতার ক্ষোভ এই ঘটনায় বিস্ফোরণ ঘটেছে।
ধর্ষণ ও হত্যা মামলা: আলোচনায় না এলেই তদন্ত থেমে যায়
পল্লবীতে শিশু ধর্ষণ ও হত্যা মামলায় মাত্র চার কার্যদিবসে দুই আসামির মৃত্যুদণ্ড একটি ব্যতিক্রমী নজির — স্বাভাবিক বাস্তবতা নয়। দেশে বেশিরভাগ ধর্ষণ ও হত্যা মামলা বছরের পর বছর তদন্ত পর্যায়েই থেকে যায়।
মিডিয়ার আলোচনা না থাকলে মামলাও এগোয় না — এটাই সত্য চিত্র।
— বিশেষজ্ঞ পর্যবেক্ষক, প্রথম আলোআইন অনুযায়ী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বেশিরভাগ ক্ষেত্রে তা মানা হয় না। ডিএনএ পরীক্ষা, মেডিক্যাল রিপোর্ট ও ফরেনসিক দীর্ঘসূত্রতার কথা বলছে পুলিশ। কিন্তু ১০টি মামলায় কারো সম্পৃক্ততা না পেয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেওয়া হয়েছে, আর বাকিগুলো এখনও ঝুলে আছে।
মানসিক স্বাস্থ্য সংকটে তরুণ প্রজন্ম
বাংলাদেশের তরুণরা আজ একটি অদৃশ্য কিন্তু ধ্বংসাত্মক সংকটের মুখোমুখি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সমীক্ষা অনুযায়ী, দেশের ১৬–১৭ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগছেন।
- তীব্র মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ও জনবল সংকট
- অপর্যাপ্ত সরকারি বাজেট বরাদ্দ
- বিশেষায়িত হাসপাতালের সীমাবদ্ধতা
- ফেসবুক, টিকটক, ইনস্টাগ্রামের অতিরিক্ত ব্যবহার
- রিলস ও শর্টস ভিডিওর কারণে অ্যাটেনশন স্প্যান হ্রাস
স্মার্টফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহার মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যকলাপে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। ছোট ভিডিওর অভ্যাস তরুণদের মনোযোগের স্থায়িত্ব মারাত্মকভাবে কমিয়ে দিচ্ছে — যা দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা ও মানসিক সুস্থতা উভয়কেই ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
৬০% ঋণই ঝুঁকিপূর্ণ — ব্যাংকের মূলধন এখন ঋণাত্মক
বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক স্থিতিশীলতা প্রতিবেদন ২০২৫ অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতে মোট বকেয়া ঋণের ৬০ শতাংশই এখন ঝুঁকিপূর্ণ। অনেক ব্যাংকের মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত এখন ঋণাত্মক।
বণিক বার্তার প্রতিবেদন আরও ভয়াবহ তথ্য দিচ্ছে। ব্যাংকের আর্থিক সক্ষমতার পরিমাপক মূলধন পর্যাপ্ততা অনুপাত বা সিআরএআর বাংলাদেশে কমপক্ষে ১২.৫০ শতাংশ থাকার কথা। কিন্তু খেলাপি ঋণের বিপরীতে প্রভিশন সংরক্ষণ করতে না পারায় অনেক ব্যাংকের এই অনুপাত এখন শূন্যের নিচে।
কিছু ব্যাংক এখন তাত্ত্বিকভাবে দেউলিয়া হওয়ার দ্বারপ্রান্তে। সাধারণ মানুষের আমানতের নিরাপত্তা নিয়ে এই পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠছে।
— বণিক বার্তা বিশ্লেষণ, জুন ২০২৬অশ্রেণিবদ্ধ পুনঃতফসিলকৃত ঋণ ২,৬৮,৭৩৩ কোটি টাকা, স্থগিতাদেশের অধীনে ঋণ ১,৮২,৪১৯ কোটি টাকা এবং অবলোপনকৃত ঋণ ৮৩,৪৭৯ কোটি টাকা — এই সম্মিলিত চিত্র বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের সার্বিক ভঙ্গুরতার প্রতিফলন।