আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, তেল শোধনাগার, জ্বালানি স্থাপনা—একের পর এক হামলায় কেঁপে উঠছে সৌদি আরব। হামলা চালাচ্ছে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীরা, যাদের এক দশক আগেও অনেকে নিছক একটি আঞ্চলিক বিদ্রোহী গোষ্ঠী ভাবত। ২০১৫ সাল থেকে চলা এই সংঘাত এগারো বছরে পা দিয়ে নতুন মোড় নিয়েছে। কীভাবে একটি ছোট ধর্মীয় আন্দোলন আজ সৌদি আরবের মতো আঞ্চলিক শক্তিকে চ্যালেঞ্জ করার জায়গায় পৌঁছাল—তা বুঝতে হলে ফিরে তাকাতে হবে ইয়েমেনের ইতিহাসে।
কেন ইয়েমেন এত গুরুত্বপূর্ণ?
ইয়েমেনের আয়তন প্রায় সাড়ে চার লাখ বর্গকিলোমিটার—বাংলাদেশের তিন গুণেরও বেশি—আর উপকূলরেখা প্রায় দুই হাজার কিলোমিটার। এক পাশে সৌদি আরব, সাগরের ওপারে ইরান, আর লোহিত সাগরের অন্য পাশে জিবুতি-ইথিওপিয়াসহ হর্ন অব আফ্রিকা। লোহিত সাগর আর এডেন উপসাগরের সংযোগস্থল বাব আল-মান্দেব প্রণালীও ইয়েমেনের পাশে। এই কৌশলগত অবস্থানের কারণেই বহু শতাব্দী ধরে ইয়েমেনের ওপর বিদেশি শক্তিগুলোর নজর।
দুই ইয়েমেনের গল্প: অটোমান, ব্রিটিশ আর কমিউনিস্ট শাসন
একসময় ইয়েমেন ছিল দুই ভাগে বিভক্ত—উত্তরাঞ্চল অটোমান সাম্রাজ্যের অধীনে, আর এডেনকেন্দ্রিক দক্ষিণাঞ্চল ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রণে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর উত্তরাঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয় ইয়েমেন রাজতন্ত্র। ১৯৬২ সালে বিপ্লবের মধ্য দিয়ে সেই রাজতন্ত্র উৎখাত হয়ে গঠিত হয় ইয়েমেন আরব প্রজাতন্ত্র (উত্তর ইয়েমেন)।
দক্ষিণাঞ্চল ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে লড়াই করে ১৯৬৭ সালে স্বাধীন হয়, এবং কয়েক বছরের মধ্যেই সেখানে বামপন্থীরা ক্ষমতায় এসে গঠন করে পিপলস ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব ইয়েমেন—আরব বিশ্বের একমাত্র কমিউনিস্ট রাষ্ট্র, যা দীর্ঘদিন সোভিয়েত প্রভাবে পরিচালিত হতো। দুই ইয়েমেনের মধ্যে আদর্শিক বৈরিতা ও অবিশ্বাস লেগেই ছিল।
একীকরণ, আলী আবদুল্লাহ সালেহ ও হুতিদের জন্ম
সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পরিস্থিতিতে ১৯৯০ সালে দুই ইয়েমেন একীভূত হয়। ১৯৭৮ সাল থেকে উত্তর ইয়েমেনের শাসক আলী আবদুল্লাহ সালেহ হন ঐক্যবদ্ধ ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট। কিন্তু ভৌগোলিক ঐক্য এলেও দুই অংশের মানুষের মধ্যে বিভেদ মেটেনি—মাত্র চার বছরের মাথায়, ১৯৯৪ সালে, দক্ষিণের বিচ্ছিন্নতাবাদীদের সঙ্গে গৃহযুদ্ধ বাধে। সালেহ তখন দক্ষিণকে দমনে আফগান যুদ্ধফেরত ইসলামপন্থী যোদ্ধাদেরও কাজে লাগিয়েছিলেন বলে ব্যাপকভাবে উল্লেখ করা হয়।
এই সময়েই, নব্বইয়ের দশকে, উত্তর ইয়েমেনের জায়দি শিয়া অধ্যুষিত অঞ্চলে নিজেদের ধর্মীয় ঐতিহ্য রক্ষার আন্দোলন হিসেবে জন্ম নেয় “আনসারুল্লাহ” (আল্লাহর সাহায্যকারী)। এর নেতা হুসাইন বদরুদ্দিন আল-হুথির নাম থেকেই গোষ্ঠীটি “হুতি” নামে পরিচিত হয়।
৯/১১-এর পর পাল্টে যাওয়া সমীকরণ
২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে হামলার পর “সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে” ওয়াশিংটনের সঙ্গে হাত মেলান সালেহ এবং পশ্চিমা সহায়তা পেতে থাকেন। একসময় যে ইসলামপন্থী যোদ্ধাদের তিনি ব্যবহার করেছিলেন, আল-কায়েদার সেই নেটওয়ার্কই এবার তাঁর প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। একই সময়ে হুতিদের সঙ্গে সরকারের সংঘাত বাড়তে থাকে। ২০০৪ সালে ইয়েমেনি সেনাবাহিনীর অভিযানে হুসাইন আল-হুথি নিহত হন, এবং ২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত হুতিদের বিরুদ্ধে একের পর এক সামরিক অভিযানে ব্যাপক রক্তক্ষয় হয়। এই দমন-পীড়নই হুতিদের আরও সংগঠিত ও যুদ্ধে অভিজ্ঞ করে তোলে।
আরব বসন্ত ও সালেহর পতন
২০১০-১১ সালে তিউনিসিয়া থেকে শুরু হওয়া আরব বসন্তের ঢেউ মিসর হয়ে পৌঁছায় ইয়েমেনেও। রাজধানী সানা, এডেনসহ বিভিন্ন শহরে তিন দশকের বেশি সময় ক্ষমতায় থাকা সালেহর বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও দমন-পীড়নের অভিযোগে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থনে ক্ষমতা হস্তান্তরের একটি প্রস্তাব নিয়ে আসে, কিন্তু সালেহ বারবার রাজি হয়েও পিছিয়ে যান। ২০১১ সালের জুনে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদের মসজিদে বোমা হামলায় তিনি গুরুতর আহত হন এবং চিকিৎসার জন্য সৌদি আরবে যান। শেষ পর্যন্ত ২০১১ সালের নভেম্বরে তিনি ক্ষমতা ছাড়তে রাজি হন; দায়িত্ব নেন ভাইস প্রেসিডেন্ট আবদরাব্বুহ মানসুর হাদি।
হাদির নেতৃত্বে “জাতীয় ঐক্যের” সরকার গঠিত হলেও তা ছিল মূলত কাগজে-কলমে। সৌদি আরব ও পশ্চিমাদের পূর্ণ সমর্থন থাকলেও সরকার দেশের ভেতরের বিভেদ কমাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারেনি; অসন্তোষ রয়ে যায়।
শত্রু থেকে মিত্র: সালেহ-হুতি জোট ও সানা দখল
ক্ষমতা ছাড়লেও সালেহ রাজনীতি থেকে সরে যাননি। তাঁর অনুগত সেনা ও রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক নিয়ে তিনি এক সময়ের প্রবল প্রতিপক্ষ হুতিদের সঙ্গেই হাত মেলান। সালেহর অনুগত বাহিনীর সমর্থন আর ইরানের সহায়তা—দুই মিলিয়ে হুতিদের শক্তি দ্রুত বাড়ে। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে তারা রাজধানী সানার নিয়ন্ত্রণ নেয়, আর ২০১৫ সালের শুরুতে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ দখল করে পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়। হাদি প্রথমে এডেনে, পরে সৌদি আরবে আশ্রয় নেন।
সৌদি জোটের যুদ্ধ ও মানবিক বিপর্যয়
হুতিদের ক্ষমতা দখল মেনে নিতে না পেরে ২০১৫ সালের মার্চে সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশকে নিয়ে সামরিক জোট গঠন করে ব্যাপক বিমান হামলা শুরু করে। সঙ্গে চলে ইয়েমেনের বন্দর ও আকাশপথে অবরোধ, যাতে খাদ্য ও ওষুধ সরবরাহ মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। বিমান হামলায় হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত হন, যাঁদের বড় অংশ নারী ও শিশু। দুর্ভিক্ষ, কলেরা ও বিশুদ্ধ পানির সংকট মিলিয়ে জাতিসংঘের হিসাবে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এই যুদ্ধে প্রাণ গেছে প্রায় চার লাখ মানুষের—যা ইয়েমেনকে বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটে পরিণত করেছে।
সালেহর মৃত্যু, আল-কায়েদা ও যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা
২০১৭ সালের শেষ দিকে সালেহ আবার পক্ষ বদলে সৌদি আরবের সঙ্গে সমঝোতার ইঙ্গিত দেন। এতে ক্ষুব্ধ হুতিরা ২০১৭ সালের ৪ ডিসেম্বর তাঁকে হত্যা করে। যুদ্ধ আর ক্ষমতার শূন্যতার সুযোগে দেশের কিছু অংশে সক্রিয় হয় আরব উপদ্বীপের আল-কায়েদা (একিউএপি)। এর বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র বহু বছর ধরেই ইয়েমেনে ড্রোন হামলা চালিয়ে আসছিল—প্রেসিডেন্ট ওবামার আমলে তা বিশেষভাবে বাড়ে, তবে স্থলসেনা পাঠানো হয়নি। ২০১৭ সালে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রথম মেয়াদের শুরুতেই ইয়েমেনে বিশেষ বাহিনীর অভিযান চালানোর অনুমতি দেন, যদিও সেই অভিযানের ফল নিয়ে বিতর্ক আছে।
আজকের হুতি: কতটা শক্তিশালী?
২০২২ সালে সৌদি আরব ও পশ্চিমাদের সমর্থনে হাদির জায়গায় গঠিত হয় প্রেসিডেন্সিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল (পিএলসি)—যা এখন ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার। একই বছর জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় হুতিদের সঙ্গে একটি যুদ্ধবিরতিও হয়।
কিন্তু হুতিদের শক্তি এখন সৌদি আরবের ধারণার চেয়ে অনেক বেশি। দেশের ভূখণ্ডের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তাদের নিয়ন্ত্রণে হলেও সেখানেই বাস করেন ইয়েমেনের অধিকাংশ মানুষ। বিভিন্ন হিসাবে, একসময় কয়েক হাজার যোদ্ধার গোষ্ঠীটির সদস্য এখন কয়েক লাখ। হুতিরা এখন সৌদি আরবের বিমানবন্দর, তেল ও জ্বালানি স্থাপনায় হামলা চালাচ্ছে এবং দাবি করছে, মক্কা-মদিনা ছাড়া সৌদির কোনো অঞ্চলই তাদের নাগালের বাইরে নয়।
হুতিদের দাবি, ২০২৬ সালের জুলাইয়ে সানা বিমানবন্দরে সৌদি বাহিনীর হামলার মধ্য দিয়ে যুদ্ধবিরতি ভঙ্গ হয়েছে—আর সেটিকেই তারা চলমান পাল্টা হামলার কারণ হিসেবে দেখাচ্ছে। সাম্প্রতিক হামলা ও সৌদি আরবের প্রতিরক্ষায় যুক্তরাজ্যের যুদ্ধবিমান মোতায়েনের খবর পড়ুন ২১ অক্টোবরের ও ২২ অক্টোবরের প্রধান খবরে।
যুদ্ধ কোন দিকে যাচ্ছে?
সৌদি আরব কখনো ভাবেনি হুতিরা এত বড় আকারের হামলা চালানোর সক্ষমতা অর্জন করবে। যুদ্ধ না থামলে সৌদি অর্থনীতি ও তেল সরবরাহের ওপরও এর বিরূপ প্রভাব পড়বে, যার ঢেউ লাগবে বিশ্ববাজারেও। নতুন কোনো যুদ্ধবিরতি বা সমঝোতা হবে, নাকি এগারো বছরের এই যুদ্ধ আরও দীর্ঘ হবে—সেটাই এখন বড় প্রশ্ন।
সাধারণ জিজ্ঞাসা
হুতি কারা?
হুতিরা উত্তর ইয়েমেনের জায়দি শিয়া অধ্যুষিত অঞ্চল থেকে নব্বইয়ের দশকে গড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক-সামরিক আন্দোলন, যার আনুষ্ঠানিক নাম আনসারুল্লাহ। প্রতিষ্ঠাতা হুসাইন আল-হুথির নাম থেকে এই নাম এসেছে।
সৌদি আরব কেন ইয়েমেন যুদ্ধে জড়াল?
২০১৫ সালের শুরুতে হুতিরা রাজধানী সানা ও প্রেসিডেন্ট প্রাসাদ দখল করলে সৌদি আরব স্বীকৃত সরকারকে ফিরিয়ে আনা ও ইরান-সমর্থিত হুতিদের ঠেকাতে সামরিক জোট গঠন করে হামলা শুরু করে।
ইয়েমেন যুদ্ধে কত মানুষ মারা গেছে?
জাতিসংঘের হিসাবে বিমান হামলা, লড়াই, দুর্ভিক্ষ ও রোগ মিলিয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় চার লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছে।
সাউথ এশিয়ান রিপোর্টের বিশ্লেষণ। ভিডিওতে বিস্তারিত দেখতে সাবস্ক্রাইব করুন সাউথ এশিয়ান রিপোর্ট বাংলা ইউটিউব চ্যানেল।



