সংগৃহীত

আমরা কি ৫৫ বছর ধরে ক্লাস ওয়ানেই আটকে আছি

গত পাঁচ দশকের বেশি সময়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি বড় হয়েছে, অবকাঠামোর ব্যাপক পরিবর্তন হয়েছে, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন সামাজিক সূচকে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি এসেছে। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার একটি মৌলিক ক্ষেত্রে আমরা যেন এখনো প্রত্যাশিত পরিণতিতে পৌঁছাতে পারিনি। সেটি হলো নীতিনির্ধারণের সক্ষমতা, প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতি এবং নেতৃত্বের ধারাবাহিকতা।

কথাটি কিছুটা কঠিন শোনাতে পারে। কিন্তু গত ৫৫ বছরের অভিজ্ঞতার দিকে তাকালে বলা যায়, নীতিনির্ধারণের ক্ষেত্রে আমরা যেন এখনো ক্লাস ওয়ানের গণ্ডিই পুরোপুরি পেরোতে পারিনি। অর্থাৎ রাষ্ট্রের বিভিন্ন খাতে নীতি প্রণয়ন, বাস্তবায়ন, মূল্যায়ন এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সংশোধনের যে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠার কথা ছিল, তা এখনো অনেক ক্ষেত্রেই শক্তিশালী হয়নি।

এর অর্থ এই নয় যে দেশে মেধাবী কর্মকর্তা, দক্ষ পেশাজীবী কিংবা ভালো নীতি প্রণয়নের সক্ষমতার অভাব রয়েছে। বরং সমস্যার একটি বড় জায়গা হলো সঠিক মানুষকে সঠিক জায়গায় দায়িত্ব দেওয়া এবং সেই দায়িত্ব পালনের জন্য প্রয়োজনীয় সময় ও ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করা। গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারণী পদে অনেক সময় সংশ্লিষ্ট বিষয়ে বিশেষায়িত জ্ঞান, মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা ও দীর্ঘদিনের কাজের ধারাবাহিকতা থাকা ব্যক্তিকে দায়িত্ব দেওয়া হয় না। ফলে কোনো খাত সম্পর্কে পর্যাপ্ত অভিজ্ঞতা নেই, এমন একজন ব্যক্তি যখন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আসেন, তখন তাঁকে প্রথমেই সংশ্লিষ্ট দপ্তর, খাত, নীতিকাঠামো, বিদ্যমান সমস্যা এবং পূর্ববর্তী উদ্যোগগুলো বুঝতে সময় দিতে হয়।

যে সময়ে একজন নীতিনির্ধারকের নীতি তৈরি, সংস্কার ও বাস্তবায়নে নেতৃত্ব দেওয়ার কথা, সেই সময়ের একটি বড় অংশ যদি তাঁকে নতুন করে খাতটি শিখতেই ব্যয় করতে হয়, তাহলে নীতির গতি ও মান—দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ধরা যাক স্বাস্থ্য খাতে একজন নতুন কর্মকর্তা দায়িত্ব পেলেন। তাঁকে শুধু স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক কাঠামো জানলেই হবে না; স্বাস্থ্য অর্থায়ন, ওষুধ সরবরাহ, জনবল, হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, স্বাস্থ্যবিমা, সরকারি ক্রয়ব্যবস্থা এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা—সবকিছু বুঝতে হবে। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো আগের সরকার বা আগের নেতৃত্ব কী সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, কেন নিয়েছিল, কী কাজ করেছে এবং কোথায় ব্যর্থ হয়েছে—সেই প্রাতিষ্ঠানিক স্মৃতিও তাঁকে জানতে হবে। একইভাবে অর্থ, শিক্ষা, কৃষি কিংবা স্থানীয় সরকার—প্রতিটি খাতের নিজস্ব জটিলতা রয়েছে।

সমস্যা আরও প্রকট হয় যখন একজন দায়িত্বশীল ব্যক্তি খাতটি বুঝতে শুরু করেন এবং কার্যকর পরিবর্তন আনার মতো অভিজ্ঞতা অর্জন করেন, ঠিক তখনই বদলি, পদায়ন বা অবসরের কারণে তাঁকে অন্যত্র চলে যেতে হয়। তাঁর জায়গায় আসেন নতুন একজন। নতুন ব্যক্তিকেও আবার একই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়—দায়িত্ব বোঝা, খাত সম্পর্কে শেখা, সমস্যা চিহ্নিত করা এবং সমাধানের পথ খোঁজা। তিনিও যখন কিছুটা পরিণত হন, তখন আবার পরিবর্তন। ফলে প্রতিষ্ঠান শেখে কম, ব্যক্তি বারবার শেখে বেশি।

ভালো নীতি কোনো এককালীন সিদ্ধান্ত নয়; এটি একটি ধারাবাহিক শেখার প্রক্রিয়া। প্রথমে সমস্যা চিহ্নিত করতে হয়, এরপর তথ্য ও প্রমাণ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করতে হয়, সংশ্লিষ্ট পক্ষের মতামত নিতে হয়, আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা বিবেচনা করতে হয়, আর্থিক ও প্রশাসনিক বাস্তবতা যাচাই করতে হয় এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে হয়। তারপর আসে নীতি বাস্তবায়ন। বাস্তবায়নের পর দেখতে হয় কী ফল হলো, কোথায় ঘাটতি রয়ে গেল এবং কী পরিবর্তন প্রয়োজন। অর্থাৎ পুরো প্রক্রিয়াটি হলো শেখা, বিশ্লেষণ, সিদ্ধান্ত, বাস্তবায়ন, মূল্যায়ন, সংশোধন।

এই ধারাবাহিকতার কোনো একটি ধাপ ভেঙে গেলে নীতির কার্যকারিতা কমে যেতে পারে। কখনো প্রয়োজনীয় নীতি গ্রহণে দেরি হয়, কখনো নীতি তৈরি হলেও বাস্তবায়নের প্রস্তুতি থাকে না, আবার কখনো ভালো উদ্যোগ নেতৃত্ব পরিবর্তনের সঙ্গে থেমে যায়। একই সমস্যা নিয়ে আমরা বারবার কমিটি গঠন করি, প্রতিবেদন তৈরি করি, কর্মপরিকল্পনা করি, কর্মশালা করি; কিন্তু কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন অনেক সময় আসে না। কারণ, সমস্যা চিহ্নিত করার ক্ষেত্রে আমরা যতটা আগ্রহী, সমাধান বাস্তবায়ন, ফলাফল মাপা এবং সেই ফলাফলের ভিত্তিতে নীতি সংশোধনের ক্ষেত্রে ততটা ধারাবাহিক নই।

নীতিনির্ধারণের সবচেয়ে বড় সম্পদ শুধু অর্থ নয়; প্রাতিষ্ঠানিক জ্ঞান ও স্মৃতিও একটি সম্পদ। একজন কর্মকর্তা বা বিশেষজ্ঞ চলে গেলে তাঁর সঙ্গে যেন পুরো জ্ঞানটিও প্রতিষ্ঠান থেকে চলে না যায়। এ জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, সুসংগঠিত তথ্যব্যবস্থা, নীতি-নথির সংরক্ষণ, নিয়মিত মূল্যায়ন এবং দায়িত্ব হস্তান্তরের কার্যকর ব্যবস্থা। একই সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ খাতে প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ জ্ঞান ও দীর্ঘমেয়াদি অভিজ্ঞতাকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে।

শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি শুধু কে কোন পদে বসবেন, তা নয়। প্রশ্ন হলো একটি প্রতিষ্ঠান কীভাবে শেখে, সেই শেখা কীভাবে ধরে রাখে এবং সেই জ্ঞান কীভাবে পরবর্তী সিদ্ধান্তে ব্যবহার করে। রাষ্ট্রের উন্নয়ন শুধু নতুন রাস্তা, সেতু, ভবন বা প্রযুক্তি দিয়ে হয় না; উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলোও প্রতিটি নীতি ও অভিজ্ঞতা থেকে শেখে এবং সেই শেখাকে পরবর্তী সিদ্ধান্তের ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে।

আমাদের গত ৫৫ বছরের উন্নয়ন নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। এখন সময় এসেছে অবকাঠামোর পাশাপাশি নীতিনির্ধারণের প্রতিষ্ঠানকেও পরিণত করার। ক্লাস ওয়ানের পাঠ বারবার নতুন করে শুরু না করে এবার আমাদের পরবর্তী শ্রেণিতে উঠতে হবে—যেখানে ব্যক্তি নয়, প্রতিষ্ঠান হবে জ্ঞানের ধারক; পদায়ন নয়, ধারাবাহিকতা হবে নীতির শক্তি; আর সিদ্ধান্তের ভিত্তি হবে তথ্য, প্রমাণ ও অভিজ্ঞতা।

  • ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

  • মতামত লেখকের নিজস্ব

source https://www.prothomalo.com/opinion/column/xa286tnbz4

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।