দুবাইয়ে গ্রেপ্তার সাবেক আইজিপি বেনজির আহমেদ — ইন্টারপোলের রেড নোটিশ থেকে আমিরাতের হাতকড়া
“পাপ বাপকেও ছাড়ে না” — এই চিরন্তন সত্যটি আবারও প্রমাণিত হলো বাংলাদেশের ইতিহাসে। একসময় যে মানুষটি দেশের সর্বোচ্চ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধান হিসেবে অপরিসীম ক্ষমতার অধিকারী ছিলেন, সেই বেনজির আহমেদ আজ বিদেশের মাটিতে হাতকড়ায় বন্দি। অর্থের লোভ, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং অন্যায়ের পরিণতি কোনোদিন মানুষকে রেহাই দেয় না।
বেনজির আহমেদ বাংলাদেশ পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি)। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তিনি এতটাই ক্ষমতাশালী ছিলেন যে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর পরেই তাঁর নাম উচ্চারিত হতো। বিলিয়ন টাকার সম্পদ, বিদেশে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান — সবকিছু নিয়ে তিনি ছিলেন এক বিতর্কিত মহাশক্তিধর ব্যক্তিত্ব।
২০২৪ সালে কালের কণ্ঠ পত্রিকায় তাঁর সম্পদ ও দুর্নীতির ওপর ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরপরই জানা গেল — তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়েছেন। পরে নিশ্চিত হওয়া যায়, তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অবস্থান করছেন।
বর্তমান বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর দুবাইয়ে বেনজির আহমেদের অবস্থান নিশ্চিত হলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে দুবাই কর্তৃপক্ষের কাছে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি প্রেরণ করা হয়। ইন্টারপোলের জাতীয় কেন্দ্রীয় ব্যুরো (NCB)-এর মাধ্যমে আবেদন জমা দেওয়া হয় এবং পরবর্তীতে ইন্টারপোল বেনজির আহমেদের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করে।
গোয়েন্দা নজরদারিতে থাকা বেনজির আহমেদ কেনাকাটার উদ্দেশ্যে বাইরে বের হলে দুবাই পুলিশ তাঁকে মাঝপথেই আটক করে। দেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশের একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা এই গ্রেপ্তারের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন।
অনেকের ধারণা, ইন্টারপোল মানে আলাদা কোনো আন্তর্জাতিক পুলিশ বাহিনী। আসলে তা নয়। ইন্টারপোল হলো দেশে দেশে পুলিশের মধ্যে সমন্বয় ও তথ্যবিনিময়ের একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা। বাংলাদেশ একটি সদস্য রাষ্ট্র হিসেবে এই সংস্থার মাধ্যমে দুবাইয়ের কাছে সহযোগিতা চায় — এবং দুবাই পুলিশ তখন আন্তর্জাতিক আইনের আওতায় বাংলাদেশের পক্ষে কাজ করে।
একইভাবে আওয়ামী লীগ সরকারও তাদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষদের বিদেশ থেকে ফিরিয়ে আনতে এই প্রক্রিয়া ব্যবহার করেছিল — এবার সেই একই প্রক্রিয়াতেই বেনজির আহমেদকে ধরা হয়েছে।
-
২০২৪ — আওয়ামী লীগ সরকারের শেষ পর্যায়কালের কণ্ঠ পত্রিকা বেনজির আহমেদের বিপুল সম্পদ ও দুর্নীতির ওপর ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ করে। দেশজুড়ে ব্যাপক সমালোচনার ঝড় ওঠে।
-
আগস্ট ২০২৪ — সরকার পরিবর্তনআওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরপরই বেনজির আহমেদ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। পরবর্তীতে নিশ্চিত হওয়া যায়, তিনি সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে অবস্থান করছেন।
-
১১ এপ্রিল ২০২৫ — ইন্টারপোলে আবেদনঢাকা পুলিশ হেডকোয়ার্টার থেকে ইন্টারপোলের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরোতে (NCB) বেনজির আহমেদকে গ্রেপ্তারের আবেদন পাঠানো হয়।
-
২০২৫ — রেড নোটিশইন্টারপোল বেনজির আহমেদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক রেড নোটিশ জারি করে এবং সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে গ্রেপ্তারের অনুরোধ জানায়।
-
জুন ২০২৬ — গ্রেপ্তারদুবাইয়ে শপিংয়ে বের হওয়ার সময় বেনজির আহমেদকে গ্রেপ্তার করে দুবাই পুলিশ। বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
- সংযুক্ত আরব আমিরাত জানিয়েছে, আগামী ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ আবেদন পাঠাতে হবে বাংলাদেশকে।
- বেনজির আহমেদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন এবং বাংলাদেশ পাসপোর্ট আইনে দুটি মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
- পুলিশ ইন্টারপোলের চ্যানেলের মাধ্যমে বিদেশী কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ ও গ্রেপ্তার পরবর্তী ফলোআপ কার্যক্রম পরিচালনা করছে।
- সব প্রক্রিয়া সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন হলে আগামী ৩০ থেকে ৩৫ দিনের মধ্যে বেনজির আহমেদকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে।