ধাতুবিদ্যার ইতিহাসেই খুঁজতে হবে সাংস্কৃতিক শিকড়

বাংলার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অনুসন্ধান করতে হলে ধাতুবিদ্যগত ঐতিহ্যের অনুসন্ধান অত্যন্ত জরুরি। মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রায় ধাতু ব্যবহারের সঙ্গে অর্থনীতি, যাপিত জীবনের বহুবিধ প্রয়োজন পূরণ, জীবনমানের উন্নয়ন, শিল্পচর্চা থেকে যুদ্ধ পর্যন্ত বহুবিধ বিষয় নিবিড়ভাবে জড়িত। এ কারণে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রামাণিক গবেষণার জন্য ধাতুবিদ্যা নিয়ে ব্যাপক পরিসরে কাজ করতে হবে। আমাদের দেশে এ বিষয়টি নিয়ে এখনো উল্লেখযোগ্য কোনো কাজ হয়নি।গতকাল শনিবার বিকেলে শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার সেমিনার কক্ষে অনুষ্ঠিত ‘বাংলার ধাতুবিদ্যাগত ঐতিহ্য: প্রযুক্তি,কারুশিল্প ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ’ শীর্ষক সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা এই মত দিয়েছেন। ইতিহাস ও ঐতিহ্য–বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ‘হেরিটেজ ফাউন্ডেশন’ এই সেমিনার আয়োজন করে।সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাবেকুন নাহার। প্রধান অতিথি ছিলেন শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিন। সভাপতিত্ব করেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক মাসুদ ইমরান। স্বাগত বক্তব্য দেন হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক জাহাঙ্গীর হোসেন।প্রধান অতিথি বলেন, নৃতত্ত্বগত দিক থেকে কোনো জাতি সম্পর্কে জানতে হলে তাদের ধাতুবিদ্যাগত সম্পদ সম্পর্কে জানাতে হয়। ইতিহাসে তাম্রযুগ, ব্রোঞ্জযুগ ও লৌহযুগের মতো যুগ বিভাগ করা হয়েছে ধাতুর ব্যবহারের ওপর ভিত্তি করে। আমাদের ধাতুবিদ্যাগত প্রাচীন ঐতিহ্য আছে; কিন্তু তা নিয়ে গভীর কোনো গবেষণা হয়নি। শিল্পকলা একাডেমিও এ বিষয়ে গবেষণা, সংগ্রহ ও সংরক্ষণে ভূমিকা রাখতে আগ্রহী বলে তিনি জানান।মূল প্রবন্ধে সাবেকুন নাহার মানবসভ্যতার ক্রমবিকাশে ধাতুর ব্যবহারের বহুমুখিতা, এর প্রভাবের বিস্তৃতি, বৈশ্বিক পরিপ্রেক্ষিতের পাশাপাশি প্রাচীন বাংলা ও বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমায় প্রাচীনকালে ধাতুর ব্যবহার, বিভিন্ন ধাতুর প্রাপ্তির উৎস, কারিগরি দক্ষতা, সাংস্কৃতিক ভূমিকা—এসব নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেন। তিনি বলেন, ধাতু ব্যবহারের সবচেয়ে প্রাচীন নিদর্শন পাওয়া গেছে বর্তমান বেলুচিস্তানের মেহেরগড় এলাকায়। এটি খ্রিষ্টপূর্ব ৬ হাজার বছর আগের। প্রাচীন বাংলার ধাতব নিদর্শন পাওয়া গেছে বিহারের সেনওয়ার এলাকায়। এটি খ্রিষ্টপূর্ব ২০০০ অব্দের। আমাদের দেশে প্রাচীন নিদর্শন পাওয়া গেছে মহাস্থান ও উয়ারী–বটেশ্বরে, খ্রিষ্টপূর্ব চতুর্থ শতকের শেষ ভাগ থেকে তৃতীয় শতাব্দী কালের।সভাপতির বক্তব্যে অধ্যাপক মাসুদ ইমরান বলেন, বাংলাদেশে প্রত্ন ধাতুবিদ্যা নিয়ে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা আগে হয়নি। এখন পর্যন্ত সাবেকুন নাহারই দেশে এ বিষয়ের একমাত্র বিশেষজ্ঞ–গবেষক। এ বিষয়ে গবেষণার অনেক অন্তরায় রয়েছে। জাদুঘর, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর বা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সংরক্ষিত নিদর্শন গবেষকদের দিতে বিশেষ আগ্রহী নয়। অথচ আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রামাণিক ও বৈজ্ঞানিক গবেষণার জন্য প্রত্নধাতুবিদ্যাগত বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন।সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন জাতীয় জাদুঘরের কিপার আকসারুজ্জামান নুরী, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের উপপরিচালক আতাউর রহমান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক আদনান আরিফ সালিম। আলোচনা পর্বের পরে ছিল প্রশ্নোত্তর পর্ব। সেমিনারটি সঞ্চালনা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের পরিচালক সাবেক অতিরিক্ত সচিব আলম আরা বেগম। লেখক, গবেষক, শিল্পী, ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অনুরাগী ও বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতত্ত্ব ও ইতিহাস বিভাগের অনেক শিক্ষার্থী সেমিনারে অংশ নেন।Read More: Read More

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top