দুই মাসে ৬০৫ খুন — বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কি নিয়ন্ত্রণের বাইরে?
📊 টিআইবি পরিসংখ্যান — মার্চ ও এপ্রিল ২০২৬
* সূত্র: টিআইবি — সরকারের ১০০ দিন মূল্যায়ন প্রতিবেদন। প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর উপর আস্থা — কিন্তু ফলাফল কোথায়?
বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার গঠনের পর সালাহউদ্দিন আহমেদকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। দলের মধ্যে তাঁর ব্যাপক প্রভাব ও প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার কারণে এই নিয়োগকে ইতিবাচকভাবে দেখা হয়েছিল। এটা উল্লেখযোগ্য যে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে কোনো প্রতিমন্ত্রী বা উপদেষ্টা নেই — সালাহউদ্দিন আহমেদই সর্বেসর্বা। এটি সরকারের পূর্ণ আস্থার প্রমাণ।
কিন্তু টিআইবির প্রতিবেদনের পরিসংখ্যান বলছে ভিন্ন কথা। মন্ত্রী নিজেও যে বিষয়টি নিয়ে স্বস্তিতে নেই, তা তাঁর আচরণ ও বক্তব্যে স্পষ্ট। অথচ দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন যে বাংলাদেশে মব সহিংসতা বলে কিছু থাকবে না।
র্যাবের নিষ্ক্রিয়তা ও এলিট ফোর্সের সংকট
বাংলাদেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির একটি বড় সমস্যা হলো র্যাবের কার্যকারিতা হ্রাস পাওয়া। বিগত সরকারের আমলে র্যাবকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহারের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এই বাহিনীর উপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে। ফলে দেশের এলিট ফোর্সটি এখন কার্যত নিষ্ক্রিয়।
পুলিশের একার পক্ষে সার্বক্ষণিক আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়। তাই র্যাবকে ভেঙে দিয়ে নতুন টার্মস অফ রেফারেন্সের ভিত্তিতে একটি স্বচ্ছ ও কার্যকর এলিট ফোর্স গঠন করা এখন সময়ের দাবি।
🔍 বিশ্লেষণ: কী করণীয়?
- বিশেষ অভিযান পরিচালনা: ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’-এর মতো একটি সমন্বিত বিশেষ অভিযান চালু করা জরুরি।
- র্যাবের পুনর্গঠন: নতুন কাঠামো ও জবাবদিহিতার ভিত্তিতে এলিট ফোর্স পুনর্জন্ম দিতে হবে।
- সেনাবাহিনীর সহায়তা: প্রয়োজনে আইনশৃঙ্খলা পুনরুদ্ধারে সেনা সহায়তা নেওয়া যেতে পারে।
- মন্ত্রণালয়ের পুনর্মূল্যায়ন: পরিস্থিতির উন্নতি না হলে মন্ত্রণালয় পরিবর্তনের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া দরকার।
বিনিয়োগ ও উন্নয়নে সরাসরি প্রভাব
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি শুধু সামাজিক সমস্যা নয়, এটি সরাসরি অর্থনৈতিক উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে। একজন সম্ভাব্য উদ্যোক্তা যদি ছিনতাই, চাঁদাবাজি বা মব সহিংসতার ভয়ে থাকেন, তাহলে তিনি বিনিয়োগ করতে সাহস পাবেন না। ছোট একটি রেস্তোরাঁও যদি ১০ জনের কর্মসংস্থান করতে পারে, তাহলে এই ভীতির পরিবেশ লক্ষাধিক সম্ভাবনাকে নষ্ট করছে।
বিদেশী বিনিয়োগের কথা তো আরও পরের বিষয়। দেশের উন্নয়নের অন্যতম মূল প্যারামিটার হলো আইন-শৃঙ্খলা — এটি নিশ্চিত না হলে অন্য কোনো অর্জনই টেকসই হবে না।
২০০১-এর স্মৃতি ও রাজনৈতিক মূল্য
বর্তমান পরিস্থিতি ২০০১ সালে বিএনপির ক্ষমতায় আসার পর দেখা আইনশৃঙ্খলার অবনতির কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে। সেই সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ পরিচালনা করে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।
বর্তমান সরকার সেই পথে হাঁটবে কিনা তা এখনই বলা সম্ভব নয়। তবে যদি দ্রুত দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেওয়া হয়, এর একটি রাজনৈতিক মূল্য সরকারকে চোকাতে হতে পারে। কারণ জনগণের শীর্ষ অগ্রাধিকারের মধ্যে নিরাপত্তা সবসময়ই প্রথম সারিতে থাকে।
উপসংহার: টিআইবির প্রতিবেদনের এই উদ্বেগজনক পরিসংখ্যান সরকারের জন্য একটি সতর্কবার্তা। মাত্র দুই মাসের হিসাবে এই অবস্থা হলে পূর্ণ বছরের চিত্র কতটা ভয়াবহ হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন এখন আর ঐচ্ছিক নয় — এটি সরকারের অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সূত্র: ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) — সরকারের ১০০ দিনের কার্যক্রম মূল্যায়ন প্রতিবেদন, ২০২৬