South Asian Report | বাংলা সংবাদ
WordPress Ready • Dark Mode Compatible
সংবাদ
আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন সবাই? South Asian Report-এ আপনাদের স্বাগতম। আমি মেশকাত শরীফ। আজকের পর্বে আমরা আলোচনা করবো বাংলাদেশের শীর্ষ পত্রিকাগুলোর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ খবরগুলো নিয়ে — সরাসরি, বিশ্লেষণসহ, আপনার জন্য।
আজকের পর্বে জানবেন, হাজার হাজার কোটি টাকার পদ্মা রেললাইন থেকে কীভাবে চুরি হয়ে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রাংশ। থাকছে চমকপ্রদ তথ্য— দেশের গ্যাস মজুদ নিয়ে বিপদসংকেত, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট, আর তুরাগ নদে ঘটে যাওয়া রহস্যজনক মৃত্যুর নেপথ্য কাহিনী। এছাড়া আন্তর্জাতিক অঙ্গনে যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড সম্প্রসারণের ইতিহাস থেকে শুরু করে ইরানের জব্দকৃত বিপুল সম্পদ আর আয়াতুল্লাহ খামেনির ঐতিহাসিক শেষকৃত্য পর্যন্ত— যে খবরগুলো সারাবিশ্বে আলোচনার ঝড় তুলেছে, সবকিছু থাকছে আজকের পর্বে।
চলুন শুরু করি দেশের খবর দিয়ে। কল্পনা করুন, প্রায় আটত্রিশ হাজার ছয়শো ঊনত্রিশ কোটি টাকা খরচ করে তৈরি একটি রেললাইন, অথচ সেটির যন্ত্রাংশই চুরি হয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। বিবিসি বাংলা জানাচ্ছে, ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে যশোর পর্যন্ত নির্মিত দুইশো ছত্রিশ কিলোমিটার দীর্ঘ এই রেলপথ দেশের অন্যতম বৃহৎ রেল অবকাঠামো প্রকল্প। কিন্তু জনবলসংকট, সীমিত ট্রেন চলাচল আর নিরাপত্তার ঘাটতির সুযোগ নিয়ে চোরচক্র হানা দিচ্ছে এই রেলপথের বিভিন্ন স্থাপনায়। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, প্রায় তিরানব্বই ধরনের গুরুত্বপূর্ণ রেল অবকাঠামোর অংশ ও যন্ত্রাংশ ইতিমধ্যে চুরি হয়ে গেছে। পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান সিএসসি এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়েকে একটি বিস্তারিত চিঠিও দিয়েছে, যেখানে পুরো প্রকল্প করিডরজুড়ে নিয়মিত চুরি ও নাশকতার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, রাষ্ট্রের এত বড় বিনিয়োগ রক্ষা করার দায়িত্ব কার? একদিকে আর্থিক ক্ষতি, অন্যদিকে বিঘ্নিত হচ্ছে ট্রেন চলাচলের নিরাপত্তা— বিষয়টি সহজে উপেক্ষা করার মতো নয়।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই আরেকটি বড় খবর, এবার জ্বালানি খাত থেকে। বণিক বার্তার প্রধান সংবাদ অনুযায়ী, দেশে উৎপাদনে থাকা গ্যাস ক্ষেত্রের মজুদ ভয়াবহভাবে কমে আসছে। বর্তমানে উৎপাদনে থাকা গ্যাস ক্ষেত্রের সংখ্যা কুড়িটি, আর চলতি বছরের জানুয়ারিতে এসব ক্ষেত্রে মজুদ ছিল ছয় হাজার তিনশো একুশ বিলিয়ন কিউবিক ফুট। কিন্তু জুন মাসে এসে এই মজুদ নেমে এসেছে ছয় টিসিএফে। পেট্রোবাংলার সাম্প্রতিক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করেই এই তথ্য উঠে এসেছে। স্থানীয় গ্যাসের বার্ষিক উৎপাদন এখন সাতশো বিসিএফে নেমে এসেছে, অর্থাৎ বর্তমান মজুদ দিয়ে চলবে মাত্র আট বছর। এখন দেখার বিষয়, সরকার কি সময়মতো নতুন মজুদ আবিষ্কারে বিনিয়োগ বাড়াবে, নাকি বিদ্যুৎ ও শিল্প খাত বড় সংকটে পড়বে? খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, চাহিদা ও জোগানের ব্যবধান বাড়তে থাকলে নতুন বিনিয়োগ বড় ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
গ্যাস প্রসঙ্গেই আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্লেষণ এসেছে দেশ রূপান্তরে। তাদের প্রধান শিরোনাম— সাশ্রয়ী এলএনজি ছেড়ে কেন এলপিজি। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বের বেশিরভাগ দেশ যখন পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ বাড়াচ্ছে, বাংলাদেশ তখন উল্টো পথে হাঁটছে। ভারতে বাড়ছে পাইপলাইন নেটওয়ার্ক, জাপানের শহরাঞ্চলে পাইপলাইনেই গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে, এমনকি যুক্তরাষ্ট্রেও বড় অংশ পাইপলাইনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু বাংলাদেশে এলএনজির আওতা কমছে, বাড়ছে ব্যয়বহুল এলপিজি-নির্ভরতা। বেসরকারি খাতের একতরফা নিয়ন্ত্রণের কারণে এলপিজির দামে লাগাম টানাও কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞদের হিসাব বলছে, এলএনজি আমদানি বাড়িয়ে পাইপলাইনে সরবরাহ দিলে বছরে বাংলাদেশের প্রায় এক বিলিয়ন ডলার সাশ্রয় সম্ভব। ভাবুন তো, একটি নীতিগত সিদ্ধান্তের অভাবে দেশের কত বড় অঙ্কের অর্থ প্রতিবছর হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে।
এবার আসি একটি গুরুত্বপূর্ণ আইনি উদ্যোগের খবরে। সমকালের প্রধান শিরোনাম— গুম প্রতিরোধে আলাদা আইন করছে সরকার। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গুমকে গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আলাদা আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যে আইনের খসড়া তৈরি হয়েছে এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে উচ্চ পর্যায়ের বৈঠকও হয়ে গেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় জারি করা অধ্যাদেশ সংসদে অনুমোদন না হওয়ায় আগেই কার্যকারিতা হারিয়েছিল, তাই নতুন করে আইন তৈরির প্রয়োজন পড়েছে। নতুন খসড়ায় সর্বোচ্চ সাজা আগের মতোই মৃত্যুদণ্ড রাখা হলেও কারাদণ্ডের বিধানে পরিবর্তন আনা হয়েছে এবং তদন্তকারী সংস্থার ক্ষেত্রেও পরিবর্তন এসেছে। এই আইন কতটা কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হবে, সেটাই এখন দেখার বিষয়।
দেশের শিক্ষাব্যবস্থার দিকে তাকালেও চিত্রটা উদ্বেগজনক। প্রথম আলোর প্রধান খবর— পাঠদানের শিক্ষক কম, প্রধান শিক্ষক নেই পঞ্চান্ন শতাংশ বিদ্যালয়ে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের তিনশো তিরাশিটি পদ শূন্য, যা মোট পদের প্রায় পঞ্চান্ন শতাংশ। ব্যানবেইসের তথ্য বলছে, দেশে বর্তমানে বিশ হাজারের বেশি বিদ্যালয়ে মাধ্যমিক স্তরে পাঠদান হয়, আর সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে সাতশো দুইটি। এসব বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকের অনুমোদিত পদ পনেরো হাজার দুইশো তিরানব্বইটি, যার মধ্যে দুই হাজার আটশো বিয়াল্লিশটি পদই শূন্য। সম্প্রতি সাতশো আটাশ জন সহকারী শিক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করা হলেও, তাতেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পদ শূন্যই থেকে যাবে। প্রশ্ন হলো, শিক্ষকশূন্য এই বিদ্যালয়গুলোতে মানসম্মত শিক্ষা আদৌ কীভাবে নিশ্চিত হবে?
শিক্ষার সংকটের পাশাপাশি রাজধানীতে চলছে আরেক ধরনের ভয়ের রাজত্ব। নয়া দিগন্তের প্রতিবেদন বলছে, শীর্ষ সন্ত্রাসীদের নাম ব্যবহার করে ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজির অভিযোগ উঠেছে। ফুটপাত থেকে শুরু করে ডিশ ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ, ট্রাক টার্মিনাল, বাজার ব্যবস্থাপনা, ঠিকাদারি আর অবৈধ জমি দখলকে কেন্দ্র করে চলছে এই চাঁদাবাজি। ভুক্তভোগীরা ভয়ে মুখ ফুটে কিছু বলতেও পারছেন না। দীর্ঘদিন কারাগারে থাকা কয়েকজন তালিকাভুক্ত শীর্ষ সন্ত্রাসী জামিনে বের হওয়ার পর তাদের পুরনো সহযোগীদের মাধ্যমে রাজধানীর অপরাধচক্র নতুন করে সংগঠিত হচ্ছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।
এই সব উদ্বেগের মধ্যেই প্রকৃতিও যেন সতর্কবার্তা দিচ্ছে। সংবাদের প্রধান শিরোনাম— লঘুচাপের প্রভাবে জুলাই-আগস্টে বন্যার আশঙ্কা। বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদী অববাহিকায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বর্তমানে ব্রহ্মপুত্র নদের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হচ্ছে, তবে আগামী পাঁচ থেকে ছয় দিনের মধ্যে পরিস্থিতি স্থিতিশীল হতে পারে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট নির্বাহী প্রকৌশলী। এছাড়া চলতি মাসে বঙ্গোপসাগরে একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হতে পারে, যার ফলে উপকূলীয় অঞ্চলে আকস্মিক বন্যার শঙ্কাও রয়েছে।
এদিকে দেশের পার্বত্য অঞ্চল থেকেও আসছে গুরুত্বপূর্ণ খবর। টাইমস অব বাংলাদেশ জানাচ্ছে, পার্বত্য চট্টগ্রামে সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা রুখতে অভিযান জোরদার করেছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী। চব্বিশে জুন থেকে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানের দুর্গম এলাকায় ধারাবাহিক অভিযান চলছে, সর্বশেষ বান্দরবানের রেতলাং এলাকায় বিশেষ অভিযান পরিচালিত হয়েছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার ভাষায়, পাহাড়ে অস্থিরতা সৃষ্টি করে একটি পক্ষ দেশকে অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করছে, আর সেই তৎপরতা রুখতেই কাজ করছে সেনাবাহিনী।
স্থানীয় প্রশাসনের চিত্রও খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। দ্য ডেইলি স্টারের প্রধান শিরোনাম— কর্মী ও নেতৃত্বের ঘাটতিতে পৌরসভার সেবা ব্যাহত। প্রতিবেদন বলছে, নির্বাচিত মেয়র-কাউন্সিলর না থাকা এবং জনবলের তীব্র সংকটে সারাদেশের পৌরসভাগুলো হিমশিম খাচ্ছে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর দেশের তিনশো ঊনত্রিশটি পৌরসভার মধ্যে তিনশো তেইশটির নির্বাচিত মেয়র-কাউন্সিলর অপসারণ করা হয়েছিল, এখন সেসব জায়গায় প্রশাসনিক কর্মকর্তারা অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করছেন। পৌরসভাগুলোতে অনুমোদিত প্রায় পঞ্চাশ হাজার পদের মধ্যে একত্রিশ হাজার একশো বিয়াল্লিশটি পদই শূন্য পড়ে আছে। বাংলাদেশ পৌরসভা সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতির ভাষায়, একজন কর্মকর্তাকে একাধিক দায়িত্ব দিলে কোনো কাজই সঠিকভাবে সম্পন্ন হয় না, আর এর সরাসরি প্রভাব পড়ে নাগরিক সেবায়।
আরেকটি চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে কালের কণ্ঠে। গত সাড়ে পাঁচ বছরে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে প্রায় এক হাজার নয়শো দুই কেজি চোরাচালানের স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে, যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় তিন হাজার সাতশো আটাশ কোটি টাকা। দুবাইকেন্দ্রিক স্বর্ণ চোরাকারবারি চক্র নিত্যনতুন উপায়ে সক্রিয় থাকার চেষ্টা করছে বলে জানা গেছে। শুধু ঢাকা নয়, চট্টগ্রামের শাহ আমানত এবং সিলেটের ওসমানী বিমানবন্দরও এখন স্বর্ণ চোরাচালানের প্রবেশপথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
এবার আসি একটি স্পর্শকাতর এবং জাতীয়ভাবে আলোচিত ঘটনায়। তুরাগ নদে ঘটে যাওয়া একাধিক মৃত্যু ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে ব্যাপক বিতর্ক ও প্রশ্ন। বিবিসি বাংলার অনুসন্ধান বলছে, গত জুন মাসের বাইশ তারিখে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাতজন নেতা-কর্মী তুরাগ নদের আশুলিয়া ঘাটে গ্রেফতার হওয়ার সময় নদীতে ডুবে নিখোঁজ হওয়ার অভিযোগ ওঠে। এরপর চার দিনে তুরাগ থেকে তিনটি মরদেহ উদ্ধার হলে ঘটনাটি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। মিছিলে অংশ নেওয়া একজন আওয়ামী লীগ কর্মী পরিচয় গোপন রেখে বিবিসিকে জানান, দলের সাতাত্তরতম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে মিছিল শেষে তারা ট্রলারে নিরাপদে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন, কিন্তু আশুলিয়া ঘাটে পৌঁছানোর সাথে সাথেই তাদের ওপর হামলা হয় এবং সাতজনকে আটক করা হয়। অন্যদিকে আশুলিয়া থানার পুলিশ দাবি করেছে, নদীতে পড়ে নিখোঁজ হওয়া বা হামলার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, এবং উদ্ধার হওয়া মরদেহের সঙ্গে এই ঘটনার কোনো সম্পর্ক নেই। নিহত সুমনের পরিবার জানিয়েছে, মরদেহে আঘাতের সন্দেহজনক দাগ থাকলেও তারা কাউকে দোষারোপ করছেন না এবং অপমৃত্যু মামলা করেছেন। মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটন বলছেন, এই ঘটনার একটি সুষ্ঠু ও স্বাধীন তদন্ত হওয়া প্রয়োজন, কারণ পালিয়ে যাওয়া মানুষ পানিতে ডুবে মারা যাওয়া, নাকি নির্যাতনের শিকার হওয়া— এই প্রশ্নগুলোর স্পষ্ট জবাব এখনো অজানা।
এবার চলে যাই আন্তর্জাতিক অঙ্গনের খবরে। গ্রিনল্যান্ডের প্রতি প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আগ্রহ নিয়ে যখন বিশ্বজুড়ে আলোচনা তুঙ্গে, ঠিক তখনই ইতিহাসবিদরা নতুন করে মনোযোগ দিচ্ছেন যুক্তরাষ্ট্রের ভূখণ্ড সম্প্রসারণের অতীত ইতিহাসের দিকে। বিবিসি মুনদোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আঠারোশো তিন সালে ফ্রান্সের কাছ থেকে লুইজিয়ানা কিনে নেন প্রেসিডেন্ট থমাস জেফারসন, মাত্র এক কোটি পঞ্চাশ লাখ ডলারে, যা যুক্তরাষ্ট্রের আয়তন প্রায় দ্বিগুণ করে দেয়। এরপর আঠারোশো আটচল্লিশ সালে মেক্সিকোর সঙ্গে যুদ্ধে জয়ের পর গুয়াদালুপ হিডালগো চুক্তির মাধ্যমে ক্যালিফোর্নিয়া, নেভাডা, ইউটাহসহ বিশাল অঞ্চল যুক্তরাষ্ট্রের করায়ত্ত হয়। ইতিহাসবিদ জে সেক্সটনের ভাষায়, এটি ছিল রীতিমতো বন্দুকের মুখে করা এক চুক্তি। এরপর আঠারোশো সাতষট্টি সালে রাশিয়ার কাছ থেকে আলাস্কা কেনা হয় মাত্র বাহাত্তর লাখ ডলারে, যা তখন সমালোচকদের কাছে 'সিওয়ার্ডের বোকামি' নামে পরিচিত হলেও পরবর্তীতে সোনা ও তেলভাণ্ডার আবিষ্কারের মাধ্যমে তা লাভজনক প্রমাণিত হয়। আর সবশেষ, উনিশশো সতেরো সালে ডেনমার্কের কাছ থেকে কেনা হয় বর্তমান ইউএস ভার্জিন দ্বীপপুঞ্জ। ডেনিশ গবেষক অ্যাস্ট্রিড অ্যান্ডারসেনের মতে, আজকের গ্রিনল্যান্ড প্রসঙ্গে যা শোনা যাচ্ছে, তার সঙ্গে সেই পুরনো ইতিহাসের আশ্চর্য মিল রয়েছে।
এবার একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উদ্বেগজনক প্রতিবেদনে আসছি, যা প্রযুক্তি জগতের দায়বদ্ধতা নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলেছে। বিবিসি ওয়ার্ল্ড সার্ভিসের একটি অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ভারতে ইনস্টাগ্রাম প্ল্যাটফর্মে এমন কিছু বিজ্ঞাপন অনুমোদন করা হচ্ছিল, যেগুলো ব্যবহারকারীদের টেলিগ্রামে থাকা ক্ষতিকর ও শিশু-শোষণমূলক কনটেন্টের দিকে পরিচালিত করছিল। বিবিসি রিপোর্ট করার পর প্রথমে ইনস্টাগ্রাম জানায়, বিজ্ঞাপনগুলো তাদের কমিউনিটি নির্দেশিকা লঙ্ঘন করছে না। তবে পরবর্তীতে মেটার কাছে মন্তব্য চাওয়া হলে তারা একাধিক বিজ্ঞাপন সরিয়ে দেয় এবং সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট সাসপেন্ড করে। টেলিগ্রাম জানিয়েছে, তারা চলতি বছর শিশু নিরাপত্তা লঙ্ঘনের সঙ্গে যুক্ত দুই লক্ষ চুয়াত্তর হাজারের বেশি গ্রুপ ও চ্যানেল সরিয়ে দিয়েছে। ভারতের সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি মদন লোকুর এই বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, প্ল্যাটফর্মগুলো তাদের দায়িত্ব এড়াতে পারে না। সাবেক ফেসবুক ভাইস-প্রেসিডেন্ট ব্রায়ান বোল্যান্ড বিবিসিকে বলেছেন, প্ল্যাটফর্মের অ্যালগরিদম মূলত ব্যবহারকারীদের ধরে রাখতে ক্রমশ উগ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ কনটেন্ট সামনে আনার দিকে ঝুঁকে থাকে, আর নিরাপত্তার চেয়ে আয়কেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। মেটা অবশ্য এই অভিযোগ অস্বীকার করেছে এবং জানিয়েছে, তারা সন্দেহজনক আচরণের ভিত্তিতে চল্লিশ লাখেরও বেশি অ্যাকাউন্ট ইতিমধ্যে নিষ্ক্রিয় করেছে। এই বছর ভারত থেকে উনিশ লাখ এবং যুক্তরাষ্ট্র থেকে বিশ লাখ রিপোর্ট জমা পড়েছে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক রিপোর্টিং সংস্থায়। এই প্রতিবেদনটি স্পষ্ট করে দেয়, প্রযুক্তি জায়ান্টদের স্বনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এখনো কতটা অপ্রতুল।
এই প্রসঙ্গ থেকে সরে এবার আসি ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ আদালতের রায়ে। বম্বে হাই কোর্ট সম্প্রতি স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে, সরকারের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করা বা স্লোগান দেওয়া কোনো ব্যক্তিকে এলাকাছাড়া করার বৈধ কারণ হতে পারে না। সোশ্যালিস্ট ডেমোক্রেটিক পার্টি অব ইন্ডিয়ার মহারাষ্ট্র শাখার সাধারণ সম্পাদক সাঈদ আহমেদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে জারি করা এক বছরের বহিষ্কার আদেশ বাতিল করে বিচারপতি মাধব জামদার মন্তব্য করেন, নাগরিকরা ভারত সরকারের দাস নয়, আর পুলিশ অফিসাররা জনগণের সেবক, কোনো মন্ত্রীর নয়। সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন ও জ্ঞানবাপী মসজিদ ইস্যুতে বিক্ষোভ করার জন্যই তার বিরুদ্ধে এই বহিষ্কারাদেশ জারি হয়েছিল। আদালত জানিয়েছে, শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ এবং স্লোগান দেওয়া সংবিধান দ্বারা সুরক্ষিত অধিকার। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণসহ অনেকেই এই রায়ের প্রশংসা করেছেন।
এবার চলুন যাই মধ্যপ্রাচ্যের একটি জটিল অর্থনৈতিক প্রসঙ্গে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ অবসানের সমঝোতার পর সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে, বিভিন্ন দেশে জব্দ থাকা ইরানের বিপুল সম্পদের ভবিষ্যৎ কী। বিবিসি নিউজ আরবির প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিভিন্ন হিসাবে এই জব্দকৃত সম্পদের পরিমাণ সাতাশ বিলিয়ন থেকে একশো বিলিয়ন ডলারেরও বেশি হতে পারে। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় অংশ রয়েছে চীনে, প্রায় বিশ থেকে পঞ্চাশ বিলিয়ন ডলার। ইরাকে রয়েছে দশ থেকে পনেরো বিলিয়ন ডলার, ভারতে সাত বিলিয়ন ডলার, আর যুক্তরাষ্ট্রের এখতিয়ারে রয়েছে মাত্র দুই বিলিয়ন ডলার। কিন্তু আসল জটিলতা হলো, এই তহবিলগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বাইরে থাকলেও সেকেন্ডারি স্যাংশনের কারণে ওয়াশিংটনের স্পষ্ট অনুমোদন ছাড়া কোনো দেশ এই অর্থ ছাড় করতে রাজি নয়। সাম্প্রতিক সমঝোতা স্মারকে ইরানকে তেল রপ্তানির সুবিধা এবং জব্দ তহবিলে প্রবেশাধিকার দেওয়ার কথা বলা হলেও, বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন যে বাস্তবে এই অর্থ ইরানের হাতে পৌঁছাতে অনেক সময় লাগতে পারে। অর্থনীতিবিদ কামরান নেদরি বলছেন, শুধু অর্থ প্রবাহিত করলেই হবে না, আগে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট মোকাবিলাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
আর ইরান প্রসঙ্গেই সবশেষ যে খবরটি না দিলেই নয়, তা হলো ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির শেষকৃত্য অনুষ্ঠান। বিবিসি নিউজ ফার্সি জানাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলায় তার মৃত্যুর চার মাসেরও বেশি সময় পর তেহরানে শুরু হয়েছে রাষ্ট্রীয় শোকপালন। ইরানি কর্তৃপক্ষের ধারণা, এই আয়োজনে এক কোটি বিশ লাখ থেকে দুই কোটি মানুষের সমাগম হতে পারে, যাকে ইতিমধ্যে 'শতাব্দীর সেরা অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া' বলে অভিহিত করা হচ্ছে। মরদেহ প্রথমে তেহরানে জনসাধারণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য রাখা হবে, এরপর কোম হয়ে ইরাকের নাজাফ ও কারবালা ঘুরিয়ে সবশেষে নিজ শহর মাশহাদে দাফন করা হবে আগামী বৃহস্পতিবার। কৌতূহলের বিষয় হলো, তার উত্তরসূরি হিসেবে বিবেচিত ছেলে মোজতবা খামেনি এই অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকবেন কিনা, তা নিয়ে এখনো স্পষ্ট কোনো ঘোষণা আসেনি। বিশ্লেষকদের মতে, এই বিশাল আয়োজন একদিকে যেমন রাষ্ট্রীয় ঐক্যের বার্তা দেওয়ার চেষ্টা, তেমনি খামেনি-পরবর্তী ক্ষমতার কাঠামো সুসংহত করার একটি বড় সুযোগও বটে।
আজকের পর্বের জন্য এটুকুই। আশা করি আজকের বিশ্লেষণ আপনাদের ভালো লেগেছে। যদি উপকারী মনে হয়, তাহলে অবশ্যই চ্যানেলটি সাবস্ক্রাইব করুন, এবং প্রিয়জনদের সাথে শেয়ার করুন। আবার দেখা হবে নতুন খবর নিয়ে। ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন। আল্লাহ হাফেজ।